পুরুষদের তুলনায় নারীরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভোগেন।কিন্তু বেশিরভাগ নারীরা তাদের সমস্যাগুলো কাউকে বলতে চান না।এর মধ্যে একটি হচ্ছে সাদাস্রাব হওয়া। যে সব নারীরা সাদা স্রাবের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্যই বলছি কখনো এই সমস্যাটি লুকিয়ে রাখবেন না। লুকানো এই সমস্যাটি আপনার জন্য ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ বিপদ।
সাদা স্রাব কী ?
লিউকোরিয়া বা সাদা স্রাব হচ্ছে নারীদের একটি বিশেষ সমস্যা। অধিকাংশ স্রাব জীবন শৈলী ও শারীর বৃত্তীয় সংক্রান্ত যার কোন চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। তবে প্রচুর পরিমাণে, রক্তে দাগ, দুর্গন্ধ যুক্ত, স্বাভাবিক রংয়ের না হলে গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।
সাধারণত, স্বাভাবিক স্রাব পাতলা এবং সামান্য চটচটে হয়। এটা অনেকটা সর্দির মত। সাধারণত যোনি সাদা স্রাবের পরিমাণ ডিম্বস্ফূটন এবং যখন মানসিক চাপের বৃদ্ধি, মাসিক চক্রে তারতম্য হয় ।
স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয়, বয়সন্ধিকালে রক্ত চলাচল বেড়ে যায় ফলে নিঃসরণ-ও বেশি হয়, যৌন মিলনকালে, যৌন আবেগে, গর্ভাবস্থায়, শরীরের রাসায়নিক সমতা বজায় রাখতে এবং যোনির কোষগুলোকে সচল রাখতে ইস্ট্রজেন (oestrogen ) হরমোনের প্রভাবে সাদা স্রাবের নিঃসরণ হতে পারে।
এছাড়া মেয়ে শিশুর জন্মের প্রথম ৭-১০ দিনের মধ্যেও সাদা স্রাবে চাপ দিতে পারে।
মায়ের শরীরে যদি অত্যাধিক হরমোন থাকে তবেও সাদাস্রাব হতে পারে।, সন্তান প্রসবের প্রথম কয়েকদিন-ও সাদা স্রাব বেশি হতে পারে, হস্তমৈথুন বা মাস্টারবেশন, অভুলেশন ( ডিম্বাণু নিঃসরণ কালে ) জন্ম বিরতিকরণ পিল ব্যবহার করলে।
আসুন জেনে নেই নারীদের সাদাস্রাব কেন হয়।আর এই সাদাস্রাব হলেই বা আপনার কী করা উচিত।
মানসিক অশান্তি
শরীরের সঙ্গে মনের একটি ভালো যোগাযোগ রয়েছে। মনের ভালো মন্দের প্রভাব অবশ্যই শরীরের ওপর পরে।তাই মানসিক চাপ হতে পারে সাদা স্রাবের অন্যতম কারণ।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টির অভাব
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টির অভাব হতে পারে সাদা স্রাবের সমস্যা।তাই বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ডিম, দুধ, মাছ, মাংস , সবুজ সবজি ও ফলমূল খেতে হবে।
কৃমির সংক্রমণ
নারীদের শরীরে পুষ্টিহীনতার জন্য কৃমির কৃমির সংক্রমণ হতে পারে।আর কৃমির সংক্রমণ হলে আপনি যা-ই খান, তার একটি বড় অংশ কৃমির পেটে চলে যাবে। কৃমির সমস্যা থেকে হতে পারে সাদাস্রাব।
অপরিচ্ছন্নতা কাপড়
অপরিচ্ছন্নতা কাপড় সঠিকভাবে না শুকিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে রেখে ব্যবহার করা মোটেই ঠিক নয়।এত করে হতে পারে সাদাস্রাবের সমস্যা।পরনের কাপড় রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করা ভালো।
জন্ম বিরতিকরণ পিল
জন্ম বিরতিকরণ পিল খাওয়ার কারণেও সাদা স্রাবের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্ক্ষা থাকে।আর যদি পিল খেতেই হয় তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
তবে প্রথমে ভয় না পেয়ে দেখুন ও বুঝে নিন আপনার সাদা স্রাবে আধিক্য কি অত্যাধিক নাকি স্বাভাবিক।যদি আপনার সামান্যতম সমস্যা মনে হয় তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক: প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ,সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা
ডা. কাজী ফয়েজা আক্তার
প্রশ্রাবের রাস্তা দিয়ে সাদা স্রাব যাওয়া (বিশেষ করে মাসিকের সময়) খুব কমন একটা সমস্যা। যেটা নিয়ে মেয়েরা রোজই আমাদের কাছে আসেন।
প্রতিদিন যেসব রোগী আমরা পাই তারমধ্যে কমপক্ষে দু`জন এমন সমস্যা নিয়ে আসেন। এই ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে দেখি, সাদা স্রাবটা কেন হয়?
সবসময় এটা স্বাভাবিক তা যেমন নয় তেমনি সব সময় এটা খারাপ তাও নয়। প্রথমেই আমরা পেশেন্টকে জিজ্ঞেস করি, অাপনার যে সাদা স্রাব যাচ্ছে তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় কিনা বা চুলকায় কিনা।
সাদা স্রাব যাওয়ার খুব কমন একটা কারণ হচ্ছে ফাঙ্গাল ইনফেকশন। দুধ ফেটে গেলে যেমন ছানা ছানা হয়ে যায়, তেমনি ফাঙ্গাল ইনফেকশন হলে সাদা স্রাব সেভাবে ছানা ছানা অাকারে বের হয়। এ
কই সঙ্গে প্রচন্ড চুলকাবে লজ্জাস্থানে। চুলকাতে চুলকাতে অনেক সময় চামড়া উঠে যায়। এক্ষেত্রে আমরা ( ডাক্তার) ফাঙ্গাসের ট্রিটমেন্ট দিই ও রোগী ভাল হয়ে যায়।
সাদা স্রাবের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, একটা মেয়ের যখন মাসিক হবে তার আগে তার স্রাবটা একটু বেশি যাবে। এটা অনেকটা স্বাভাবিক।
অাবার মাসিকের পরপর তার স্রাবটা একেবারেই থাকে না। অাবার মাসিক যখন শেষ হয়ে যায় তখন স্রাবটা থাকে পাতলা, পরিষ্কার ও পানির মতো।
মাসিক যখন মাঝামাঝি অাসে তখন স্রাবটা হয় নাকের সর্দির মতো। আবার যখন মাসিকের কাছাকাছি অাসে তখন স্রাব হয় ফাটা ফাটা দুধের মত। কিন্তু এর সঙ্গে যদি দুর্গন্ধ না থাকে, চুলকানো না থাকে তাহলে এটা একদম স্বাভাবিক।
একটা মেয়েকে বুঝতে হবে, যে প্রত্যেক মেয়েরই কিছুটা সাদা স্রাব যায়।
সাদা স্রাব সব সময় স্বাভাবিক তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো এটা অস্বাভাবিকও হতে পারে। এমনকি এটা জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের কারণও হতে পারে। অতিরিক্ত সাদা যাওয়া। এই সাদা স্রাবের ধরনটা হয় চাল ধোয়া পানির মতো নোংরা।
এই স্রাবটা প্রচন্ড দুর্গন্ধযুক্ত হয়। এটা তখন এতো বেশী পরিমাণ যায়, টিস্যু বা প্যান্টি কোন কিছু দিয়ে একে আটকে রাখা যায়না। এ অবস্থায় আমরা পরীক্ষা করে দেখি, তার জরায়ুর মুখে টিউমার বা এমন কিছু আছে কি-না।
যদি দেখি, খালি চোখে কিছু দেখা যাচ্ছে না তখন তাকে `পেপস` নামক একটা টেস্ট করতে দিই। এই টেস্ট বলে দেয় তার জরায়ুতে ক্যান্সারের কোন পূর্ব লক্ষণ আছে কি-না।
জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের একটা পূর্বধাপ আছে। এই অবস্থায় যদি ধরা পড়ে এবং ঠিক মতো চিকিৎসা হয় তাহলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এজন্য যখনই সাদা স্রাব যাবে, দেখতে হবে এটা কী স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক। সব সময় অস্বাভাবিকটা মাথায় রেখেই স্বাভাবিকটার চিকিৎসা করতে হবে।
(লেখক: ডা. কাজী ফয়েজা অাক্তার, এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমসিপিএস। কনসালটেন্ট, ইমপালস হাসপাতাল। ও সহকারী অধ্যাপক, গাইনী, প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।)
মেয়েদের লিউকোরিয়া বা সাদাস্রাব এর কারণ লক্ষণ ও প্রতিকার কি জেনেনিন
বিবাহিতা হোক আর অবিবাহিতাই হোক, সাদা স্রাব অনেক মেয়েদেরই একটি প্রধান শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। Lic অর্থাত্ সাদা, Ria-Passing অর্থাত্ প্রবাহমান বা স্রাব। তাই Licuria কথাটির মানে হচ্ছে সাদা স্রাব। যোনিপথে সাদা তরল পদার্থ নির্গত হওয়াকেই ডাক্তারী ভাষায় লিউকোরিয়া (Leucorrhoea) বা সাদা স্রাব বলে। চলুন জেনে নিই লিউকোরিয়ার কারণ ও প্রতিকার।
স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক মেয়েদেরই ডিম্বনালী, জরাযু ও যোনিপথ থেকে সামান্য কিছু সাদা স্রাব নিঃসৃত হতে পারে। অতিরিক্ত সাদাস্রাব মেয়েদের যৌনাঙ্গে ভেজা স্যাত স্যাতে অনুভুতির সৃষ্টি করে যা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসকে ব্যাহত করে। লিউকোরিয়া হলে চুলকোনিও থাকতে পারে। কাপড় অনেক সময় বাদামি বর্ণের দাগেরও সৃষ্টি করে। সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যভাবে চলাফেরায় ব্যঘাত ঘটায় এবং দৈনন্দিন জীবনে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে থাকে।
কারণ -
বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিমান সাদাস্রাব হতে পারে। তার সবগুলিই বড় রোগ নয়। যেগুলো অস্বাভাবিক ও চিকিত্সার প্রয়োজন হয়, সেগুলিকেই শুধু প্রচলিত অর্থে লিউকোরিয়া বা সাদাস্রাব বলা হয়। স্বাভাবিক যে সব কারণে সাদাস্রাব হয়ে থাকে-
১. জন্মের পর মেয়েশিশুদের ১ থেকে ১০দিনের মধ্যে কোন কারণ ছাড়াই এমনতিইে যোনিপথে সাদাস্রাব নির্গত হতে পারে এবং ২ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই আবার তা ঠিক হয়ে যেতে পারে।
২. অনেকের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে মাসিক শুরু হবার আগে ও পরে কয়েকদিন কোন সমস্যা ছাড়া সামান্য সাদা স্রাব স্বাভাবিকভাবেই নির্গত হতে পারে।
৩. জন্মবিরতিকরণ পিলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সাদাস্রাব হতে পারে। গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন কারণে সাদাস্রাব হতে পারে। গরম আবহাওয়ায় অনেক সময় অধিক ক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করলে, সাদাস্রাব হতে পারে।
উপরোক্ত কারণগুলি ছাড়াও, অপুষ্টিতে ভুগলে, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ-উত্কন্ঠা থাকলে সাদাস্রাব হতে পারে। উপরে উল্লেখিত কারণে সাদাস্রাব হলে, তার চিকিত্সা খুব একটা জরুরী নয়। তবে রোগী ইচ্ছে করলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিন্ত ও সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু এর বাইরে অন্যকোন শারীরিক কারণে হলে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই উপযুক্ত চিকিত্সা করা উচিত। প্রাপ্তবয়স্কদের সাদা সৃাব জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েই বেশীরভাগ হয়ে থাকে। আর তারমধ্যে, আমাদের দেশে অন্যতম প্রধান ৪টি কারণ হচ্ছে- ক্যান্ডিডিয়েসিস, ট্রাইকোমোনিয়েসিস, গনোরিয়া এবং ক্লামাইডিয়াল ইনফেকশন নামক ৪টি সংক্রামক যৌনরোগ।
লক্ষণ -
যৌনসংক্রামক রোগ বা জীবাণু সংক্রমণের দ্বারা সাদাস্রাব হলে তার প্রাথমিক প্রধান লক্ষণ হচ্ছে, অতিরিক্ত পরিমাণে সাদাস্রাব হওয়া, দূর্গন্ধযুক্ত হওয়া এবং যৌনাঙ্গে চুলকোনী বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেওয়া।
দীর্ঘদিন থাকলে তা থেকে পরবর্তীতে তলপেট ও যোনিতে ব্যথা হতে পারে।
জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট সাদাস্রাব পূর্ণ নিরাময় যোগ্য।
মুখে শুনে এবং যৌনাঙ্গ ও স্রাবের লক্ষণ অনুযায়ী (এবং সম্ভব হলে ল্যাবরেটরী টেষ্ট করিয়ে) সহজেই সাদা স্রাবের সুচিকিত্সা করা সম্ভব।
চিকিত্সা -
প্রথমেই রোগের কারণটি বুঝতে হবে। যদি কোনো রোগ ছাড়াই হয়, মানে যদি ফিজিওলজিক্যাল লিউকোরিয়া হয়, তাহলে ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে এবং আশ্বস্ত করতে হবে। ঋতুস্রাবের সমস্যা, অন্যান্য সমস্যা দূর করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে যেতে হবে। অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে রোগ অনুযায়ী চিকিত্সা দিতে হবে। জীবাণুঘটিত কারণে হলে টিনিডাজোল, মেট্রোনিডাজোল গ্রুপের ওষুধ খেতে হয়। অনেক সময় অ্যান্টিফাংগাল ক্রিম, ভ্যাজাইনাল ট্যাবলেট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। বিবাহিত হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই চিকিত্সা নিতে হয়।
পরামর্শ -
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত ধোয়া অন্তর্বাস পরতে হবে। ১০০ ভাগ সুতি অন্তর্বাস হতে হবে। কুসুম গরম জল ও কম ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার করতে হবে।
কোনোরকম সুগন্ধি স্প্রে ব্যবহার করবেন না। পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত জল খাবেন। খাবার তালিকায় যেন রসালো ফল, শাকসবজি থাকে।
প্রতিকার মনে রাখতে হবে, মানসিক দুঃচিন্তা, ব্যক্তিগত অপরিচ্ছন্নতা ও অপুষ্টি এ সমস্যা আরো বাড়িয়ে তোলে। কাজেই এ ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে, নিজের শরীর স্বাস্থ্য সবসময় সুস্থ রাখতে হবে, সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করতে হবে, দুঃচিন্তা ত্যাগ করতে হবে এবং সমস্যা দেখা দিলে তা জটিল হবার পূর্বেই চিকিত্সক এর পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিত্সার ব্যবস্থা করতে হবে। দেরি করা যাবে না মোটেও |


0 Comments